ওর স্যালাইন খাওয়ার উপকারিতা | ওর স্যালাইন খাওয়ার নিয়ম

ওর স্যালাইন খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। তবে ওর স্যালাইন খাওয়ার উপকারিতা মাথায় আসলে আমরা ওর স্যালাইন খাওয়ার উপকারিতা হিসেবে একটাই কথা মনে করি সেটা ডায়রিয়ার থেকে ভালো হওয়ার। 

আজকের আর্টিকেলটি তে আমরা জানবো ওর স্যালাইন খাওয়ার উপকারিতা ও ওর স্যালাইন খাওয়ার নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত।

সূচিপত্র: ওর স্যালাইন খাওয়ার উপকারিতা|ওর স্যালাইন খাওয়ার নিয়ম 

ওর স্যালাইন খাওয়ার উপকারিতা 

খাওয়ার স্যালাইন বা ওরস্যালাইন হচ্ছে ডায়রিয়া বা যে কোন পানিস্বল্পতা রোগে একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবন রক্ষাকারী উপাদান। ওর স্যালাইন খাওয়ার উপকারিতা বা খাবার স্যালাইন হচ্ছে শরীরের পানিস্বল্পতা ও লবণঘাটতি পূরণ করার জন্য মুখে গ্রহনযোগ্য লবণ ও গ্লুকোজ মিশ্রিত পানি। ডায়রিয়া বা কলেরায় ঘন ঘন পাতলা পায়খানা এবং অতি গরমে ঘামের কারণে অতি অল্প সময়ে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। ফলে সোডিয়াম এবং পটাশিয়ামের ঘাটতি মানবদেহেরর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়। 

পানিস্বল্পতা পূরণ বা রিহাইড্রেশন এসব ক্ষেত্রে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পদ্ধতি। এইসব রোগে যে স্যালাইন মুখে খেতে হয় সেটিই ওরস্যালাইন বা খাবার স্যালাইন।১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ওরস্যালাইনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

ওর স্যালাইন আবিষ্কারক 

ওর স্যালাইনের আবিস্কারকের নাম ডা. রফিকুল ইসলাম। ১৯৩৬ সালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে রফিকুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। পরে তৎকালীন আইসিডিডিআর-এ ১৯৬০ সালে যোগ দেন। তিনি আইসিডিডিআরবিতে থাকাকালীন সময়ে বেশ কিছু ওষুধ আবিষ্কার করেন। সেখানেই তিিন ওর স্যালাইনের আবিষ্কার করেন।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রচুর বাংলাদেশি শরণার্থী কলেরা ও ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হয়। সে সময়ে এই রোগীদের বাঁচাতে ওর স্যালাইনের প্রয়োগ করেন ডা. রফিকুল ইসলাম। 

এবং এতে যথেষ্ট ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তার আবিষ্কার ওর স্যালাইনকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডা. রফিকুল ইসলামের ওর স্যালাইনকে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীতে দেশি এনজিও ব্র্যাক এই ওর স্যালাইনকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়।

ঘরোয়া উপায় সেলাইন

চাইলে ঘরেও তৈরি করে নিতে পারেন মূল্যবান ওর স্যালাইন। এজন্য এক মুঠো গুড়, তিন আঙুলের ডগা দিয়ে এক চিমটি লবণ আধা লিটার পানিতে ভালোভাবে মিশিয়েই তৈরি করে নিতে পারেন ওর স্যালাইন‌ একদম ঘরোয়া উপায়ে।

কি কি সমস্যায় ওর স্যালাইন খাওয়া যায়

  • তাৎক্ষণিক শরীর দুর্বলতার ক্ষেত্রে গ্লুকোজ খেলে কাজ হয়। কিন্তু স্যালাইন খেলেও তাৎক্ষণিক দুর্বলতা অনেকটা দূর হয়। কারণ স্যালাইনে সোডিয়াম ক্লোরাইডের পাশাপাশি গ্লুকোজও থাকে।
  • অনেকের লো প্রেশারের বা নিম্ন রক্তচাপের সমস্যা থাকে। অনেক সময় তাদের রক্তচাপ স্বাভাবিক তুলনায় অনেক কমে যায়। এটা মূলত রক্তে সোডিয়াম আয়নের অভাবে হয় এবং এরফলে হার্ট বা হৃদপিণ্ড পাম্প করার পর্যাপ্ত শক্তি পায় না। এক্ষেত্রে স্যালাইন খেলে তাৎক্ষণিক ভাবে রক্তে সোডিয়াম আয়নের অভাব পূরণ হয় এবং রক্তচাপ স্বভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। কারোর যদি প্রেশার বা রক্তচাপ বেশি কমে যায়, তবে তাকে সাথে সাথে এক গ্লাস স্যালাইন খাইয়ে দিতে পারেন। এতে তাৎক্ষণিকভাবে উপকার পেতে পারেন।
  • খুব গরমে বা তীব্র রৌদ্রে কাজ করার পর স্যালাইন খেলে শরীরে লবণের অভাব পূরণ হয় এবং আপনি আবারও পুনরায় কাজ করার উদ্যোম পাবেন।
  • দীর্ঘ কয়েকদিন একনাগাড়ে কাজ করার পর অনেক সময় আপনার কিছুই ভালো লাগে না এবং কাজে মনযোগ বসাতে পারেন না। কোনো কোনো সময় শরীর হালকা দুর্বল লাগে। এক্ষেত্রে স্যালাইন খেলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
  • অতিরিক্ত কাজের চাপে বা টেনশনে থাকার কারণে অথবা দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করে বাসায় আসার পর দেখা যায় যে, হালকা মাথা ব্যথা করছে। এক্ষেত্রে স্যালাইন খেলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে।
  • বিভিন্ন জার্নালে বলেছে যে, স্যালাইন পরিপাক নালী পরিস্কার রাখতে সাহায্য করে।
  • এবার তাহলে বুঝলেন যে, স্যালাইনের কত গুণাগুণ রয়েছে। হয়তো, সবাই এই সম্পর্কে আগে থেকে এতো কিছু জানতেন না বা কিছু বিষয় আজকে নতুন জানতে পারলেন।

ওর  স্যালাইন খাওয়ার  সতর্কতা

  • কোনোভাবেই পানির পরিমাণ কম বেশি করা যাবে না, এক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল তো পাওয়া যাবেই না, বরং শিশুদের ক্ষেত্রে ক্ষতিও হতে পারে।
  • কোনোভাবেই ওর স্যালাইনে পানি ছাড়া অন্য কিছু যেমন দুধ, স্যুপ বা ফলের জ্যুস বা সফট ড্রিংকসেও মেশানো যাবে না। এমনকি চিনিও মেশানো যাবে না।
  • শিশুদের ক্ষেত্রে ওর স্যালাইন কাপে করে খাওয়ানোই ভালো, কারণ ফিডিং বোতল পুরোপুরি পরিষ্কার করা ঝামেলা হয়ে যায় অনেকসময়।
  • গরম পানিতে ওর স্যালাইন বানানো যাবে না। ওর স্যালাইনের পানিও গরম করা যাবে না।
  • বানানোর পর ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ওর স্যালাইন ভালো থাকে। অর্থাৎ বানানোর ১২ ঘণ্টা পর আর ওর স্যালাইন খাওয়া যাবে না, সেটি ফেলে দিতে হবে।

ওর স্যালাইনে পানি, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও গ্লুকোজ বা শর্করা থাকে। এখানে গ্লুকোজের প্রধান কাজ, অন্ত্রে লবণ শোষণে সাহায্য করা। প্রতি লিটার খাওয়ার ওর স্যালাইনে গ্লুকোজের পরিমাণ ২০ গ্রামের বেশি নয় এবং এর প্রায় পুরোটাই অন্ত্রে লবণ শোষণে ব্যবহার করা হয়। তাই ডায়রিয়ায় ওর স্যালাইন খেলে ডায়াবেটিসের রোগীর রক্তে শর্করা বাড়বে,এমন ধারণা ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে ওর স্যালাইন মূলত লবণের ঘাটতি পূরণ করার কাজে ভূমিকা রাখে। শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্ম বজায় রাখতে লবণের ভারসাম্য রক্ষা করাটা খুবই জরুরি। আর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে আমরা প্রচুর লবণ হারাই। তাই উচ্চ রক্তচাপের রোগীরও ডায়রিয়া হলে ওর স্যালাইন খেতে হবে, এতে লবণের আধিক্য হবে না বা রক্তচাপও বাড়বে না।

ডায়রিয়া হলে স্যালাইন খাওয়ার মাধ্যমে পানি-লবণের ঘাটতি দ্রুত পূরণ না করলে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়বে, লবণের অভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়বে। পানিশূন্যতা থেকে কিডনি অকার্যকারিতাও হতে পারে। যেসব ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীর আগে থেকেই কিডনিতে সামান্য সমস্যা আছে, ডায়রিয়ায় তাঁদের আরও বেশি জটিলতা হতে পারে। তাই ডায়রিয়া হলে সবাইকেই স্যালাইন খেতে হবে। এ নিয়ে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ নেই। ডায়াবেটিসের রোগীরা সেই সঙ্গে বারবার রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করে দেখবেন ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা রক্তচাপ মাপবেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url